টবে গোলাপ চাষ ও পরিচর্যার সহজ নির্দেশিকা

টবে গোলাপ চাষ ও পরিচর্যার সহজ নির্দেশিকা

গোলাপ এক অনন্য সুন্দর ফুল, যা শীতকালে বেশি জন্মে, তবে এখন সারা বছরই এর চাষ করা হয়। সৌন্দর্য, ঘ্রাণ এবং বৈচিত্র্যের কারণে গোলাপকে “ফুলের রানি” বলা হয়। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবেও গোলাপের চাষ হচ্ছে এবং এটি আর্থিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


 জলবায়ু ও মাটি

গোলাপ মূলত শীতপ্রবণ ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের একটি ফুল। অতিরিক্ত গরম বা আর্দ্র পরিবেশে গোলাপ গাছ ঠিকমতো বৃদ্ধি পায় না। প্রায় ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, ৮৫% আপেক্ষিক আদ্রতা এবং ১০০ থেকে ১২৫ সেন্টিমিটার বার্ষিক বৃষ্টিপাত গোলাপ চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।


গোলাপের জাত

বাংলাদেশে গোলাপ চাষে বেশ কিছু জনপ্রিয় জাত রয়েছে, যেমন - মিরান্ডি, পাপা মেলান্ড, ডাবল ডিলাইট, তাজমহল, প্যারাডাইস, ব্লু-মুন, মন্টেজুমা, টাটা সেন্টার, এবং সিটি অব বেলফাস্ট। এই জাতগুলো তাদের সৌন্দর্য এবং সুগন্ধের জন্য পরিচিত। 


রোপণ সময়

বাংলাদেশে গোলাপ চাষের জন্য উপযুক্ত সময় হলো অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত। এই সময় চারা রোপণ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। সাধারণত, গোলাপ বীজ, কাটিং, গুটি কলম এবং চোখ কলমের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে, তবে বাণিজ্যিক চাষের জন্য কাটিং এবং কলম করাই উত্তম।


টবে গোলাপের চাষপদ্ধতি

টবের অবস্থান:গোলাপ গাছের টব এমন খোলামেলা স্থানে রাখতে হবে যেখানে পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস প্রবাহ থাকে এবং গাছ দৈনন্দিন অন্তত ৬-৮ ঘণ্টা সূর্যালোক পায়। সকালে রোদ লাগলে ভালো হয়, কিন্তু গ্রীষ্মকালে দুপুরের তীব্র রোদ বা বিকেলের রোদ যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এতে ফুলের রং ফ্যাকাসে হয়ে যেতে পারে।

গাছের চারদিক থেকেই আলো পৌঁছানো জরুরি, নইলে গাছটি একদিকে ঝুঁকে বেড়ে উঠবে। তাই মাঝে মাঝে টব ঘুরিয়ে দিতে হবে যেন সব দিকে সমান আলো পড়ে। গরমকালে অতিরিক্ত রোদ থেকে বাঁচাতে টবটিকে কখনও রোদে আবার কখনও ছায়ায় রেখে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে যত্ন নিলে গাছ সতেজ থাকবে এবং দীর্ঘ সময় ধরে সুন্দর ফুল পাওয়া যাবে।

মাটি তৈরি:গোলাপ চাষের জন্য এঁটেল মাটি সাধারণত উপযুক্ত নয়, কারণ এতে পানি জমে থাকে। টবে যে মাটি ব্যবহার করা হবে তা অবশ্যই ঝুরঝুরে ও পানি সহজে বের হতে পারে – এমন হতে হবে। এজন্য মাটির মিশ্রণ তৈরির ভালো উপায় হলো:

  • ১ ভাগ দোআঁশ মাটি

  • ৩ ভাগ গরুর গোবর সার বা কম্পোস্ট

  • আধা ভাগ নদীর সাদা বালি (এতে মাটি ফাঁপা থাকে)

এগুলোর সঙ্গে ১ মুঠো সরিষার খৈল ও ১ চামচ চুন মিশিয়ে পুরো মিশ্রণটি একটি ২০ সেমি (৮ ইঞ্চি) টবে দিয়ে ১ মাস রেখে দিতে হবে। এই সময়ে মাঝে মাঝে পানি দিয়ে মাটি উল্টে-পাল্টে দিলে সার আর মাটি আরও ভালোভাবে মিশে যায়।

অনেকে মাটির মিশ্রণে ব্যবহৃত চা পাতা (ব্যবহারের পর শুকিয়ে নেওয়া) মিশিয়ে আরও ভালো ফল পেয়েছেন।

টবের নিচের দিকে কয়েক সেমি অংশে ইটের টুকরা বা ভাঙা মাটির হাড়ি বিছিয়ে দিতে হবে, যাতে অতিরিক্ত পানি বের হতে পারে


সার প্রয়োগ: টব বসাবার ১ মাস পর থেকে ১৫-৩০ দিন অন্তর অন্তর সার দিতে হবে। শীতের ঠিক পরেই অর্থাৎ মার্চের শেষে বা এপ্রিলের প্রথম দিকে টবের উপরের ৮/১০ সেমি মাটির স্তর তুলে দিয়ে খালি জায়গায় পচা গোবর সার ও নতুন ফাঁপা মাটি দিয়ে ভরে দিতে হবে। এর পর খড় বা পাতা দিয়ে ঢেকে গ্রীষ্মের প্রখর রোদ থেকে গাছের শিকড়কে রক্ষা করতে হবে। শীতকালে গাছ ছাটার পর, প্রতি টবে ৩ মুঠা গুঁড়া গোবর সার ও ১ মুঠা স্টিমড হাড়ের গুঁড়া বা স্টেরামিল প্রয়োগ করিতে হইবে। পরবর্তীতে পুরো শীতকালে ১ মাস পর পর ১ মুঠা করে স্টিমড্ বোন মিল বা স্টেরামিল প্রয়োগ করতে হবে।

গোলাপ গাছে বেশি ফুল উৎপাদনের জন্য পাতার সার ও ফলিয়ার স্প্রের জনপ্রিয়। কয়েকটি রাসায়নিক সার মিশিয়ে এই সার প্রস্তুত করতে হয়। শীতকালে সকাল ৮টার মধ্যে ফলিয়ার স্প্রে করতে হয়। দুই প্রকারের পাতা সার গাছে ব্যবহার করা হয়, ১টি গাছের স্বাস্থ্য ও ফুল ভাল করার জন্য অপরটি ট্রেস এলিমেন্টের জোগান দেয়ার জন্য, যেমন- ইউরিয়া, ডাই-অ্যামোনিয়াম সালফেট ও ডাই-পটাশিয়াম ফসফেট প্রতিটি ১০ গ্রাম করে ১০ লিটার পানিতে গুলে স্প্রে দ্রবণ তৈরি করতে হবে। ট্রেস এলিমেন্টের জন্য ম্যাগনেশিয়াম সালফেট ২০ গ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ সালফেট ১৫ গ্রাম, ফেরাস সালফেট ১০ গ্রাম, বোরাক্স ৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে প্রতি লিটার পানিতে উল্লেখিত মিশ্রণটির ২ গ্রাম করে গুলিয়ে স্প্রে করতে হবে। দুইটি পাতা সারের সাথেই কীটনাশক বা বালাইনাশক মিশিয়ে স্প্রে করা যায় কিন্তু দুটি সার এক সাথে মিশিয়ে স্প্রে করা যাবে না।

পাতার সার টবের গোলাপের জন্য অপরিহার্য এবং জমির গোলাপের জন্য উপকারী। পাতার দু’দিকেই ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে। রাসায়নিক তরল সারের পরিবর্তে গোবর ও সরিষার খৈল ৪/৫ দিন পানিতে পচিয়ে তরল করে সপ্তাহে ২ দিন করে ব্যবহার করা যাবে। গাছের নতুন ডাল-পালা বাড়াতে ও ফুলের আকার বড় করতে এ ধরনের তরল সার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তরল সারের অভাবে ছোট মাছপঁচা পানি গাছের গোড়ায় দেওয়া যাবে। দুর্বল গাছে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম করে ইউরিয়া মিশিয়ে সকাল বিকাল পাতায় স্প্রে করলে গাছ তাজা থাকে।



Comments

Popular Posts